হেবেই প্রদেশ

হেবেই প্রদেশ চীনের উত্তরে অবস্থিত। এটা বেইজিং ও তিয়ানজিন মহানগরী দ্বারা পরিবেষ্টিত। এটা স্বায়ত্বশাসিত অঞ্চল ইনার মঙ্গোলিয়াকে যুক্ত করেছে উত্তরে, দক্ষিণে হেনান প্রদেশ, উত্তর-পূর্বে লিয়াওনিং প্রদেশ এবং দক্ষিণ-পূর্বে শ্যাংডং প্রদেশকে যুক্ত করেছে।

হেবেই এর ঘটনাপঞ্জি
চেংদে, রেহে রাজ্য এবং ঝাংজুয়াকাউ এবং তারপর চাহার রাজ্যের কিছু অংশের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তনের ঘটনা ঘটেছে। এই সব অঞ্চলগুলি পরবর্তীতে হেবেই প্রদেশের অন্তর্ভূক্ত হয়েছে এবং চীনের ‘গ্রেট ওয়াল’ ছাড়িয়ে এর পরিধি বৃদ্ধি করেছে । ঐ সময়ে তিয়ানজিন থেকে রাজধানী স্বল্প সময়ের জন্যে শিজিয়াঝুয়াং এ সরিয়ে নেয়া হয়।

১৯৭৬ সালের ২৮ জুলাই সবচেয়ে বেদনাদায়ক ভূমিকম্প সংঘটিত হয়। এতে ২৪,০০,০০ লোক মারা যায়। পরবর্তীতে কয়েকটি ছোট ভূমিকম্প এই শহরে আঘাত হানে।

হেবেই এর ভৌগলিক অবস্থান
হেবেই এর অধিকাংশই কেন্দ্র ও দক্ষিণে ‘হাই’ জলবিভাজিকার অন্তর্ভূক্ত। পূর্বে এটি বোহাই সমুদ্রকে সংযুক্ত করেছে। হেবেই এর পাহাড় পর্বতসমূহে বেশ কিছু জলাধার রয়েছে। আনসিন কাউন্টিতে হেবেই এর সবচেয়ে বড় হ্রদগুলির অন্যতম ‘বাইইয়াংদিয়ান’ রয়েছে।

হেবেই প্রদেশে মহাদেশীয় মৌসুমী জলবায়ু বিদ্যমান। জানুয়ারী মাসে তাপমাত্রা -১৬ ডিগ্রী থেকে -৩০ ডিগ্রী সে. এবং জুলাই মাসে ২০ ডিগ্রী থেকে ২৭ ডিগ্রী সে. থাকে। গ্রীষ্মের মাসগুলিতে বেশির ভাগ বৃষ্টিপাত হয়- বছরে ৪০০ মি.মি. থেকে ৮০০ মি.মি.।

ঝাংজিয়াকাউ শহর, হানডান, কিংহুয়াংডাও, বাওডিং, টাংশান এবং শিজিয়াঝুয়াং শহরগুলি হলো হেবেই প্রদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শহর।

হেবেই এর অর্থনীতি
২০০৬ সালে হেবেই ১.১৬ ট্রিলিয়ন ইউয়ান জিডিপি অবদানের কারণে প্রবৃদ্ধি তালিকায় ষষ্ঠ স্থান দখল করে যা আগের বছরের তুলনায় ১২.৯% বেশী। মাথাপিছু জিডিপি ছিল ১৬,৫৭০ রেনমিনবি এবং বেকারত্ব হার ছিল শুধু ৪%।

হেবেই প্রদেশে খাদ্যশস্যের মধ্যে গম, ভুট্টা, বাজরা এবং সরঘাম হলো কৃষিজাত প্রধান দ্রব্যসমূহ। হেবেই প্রদেশে উতপাদিত অন্যান্য অর্থকরী ফসল হচ্ছে তুলা, চীনাবাদাম, তিল এবং সয়া। হেবেই প্রদেশে পূর্ণ বিকশিত টেক্সটাইল, কয়লা, স্টিল, লোহা, কারিগরী, রসায়ন, পেট্রোলিয়াম, সিরামিক ও খাদ্যশিল্প রয়েছে।

হেবেই প্রদেশের সংস্কৃতি
হেবেই প্রদেশে চীনা ঐতিহ্যবাহী অপেরা হচ্ছে ‘পিংজু’ এবং ‘হেবেই বাংজি’। পিংজু সহজেই বোঝা যায়। পিংজু অধিকাংশ দর্শক পছন্দ করে। এটা শুরু হয়েছিল হেবেই প্রদেশের উত্তর-পূর্ব অংশে এবং বেইজিং অপেরার মতোই দর্শকপ্রিয়তা লাভ করেছে।

মধ্য হেবেই এর ডিংঝুউ পোরসেলিনের তৈরী বিভিন্ন ধরনের ফুলদানী, কাপ, প্লেট, বোউল এর জন্য খুবই বিখ্যাত। সাধারনতঃ পোরসেলিন হলো ক্রিমের মতো সাদা রঙের কিন্ত্ত অন্যান্য রং মিশিয়েও তৈরী হয়।

হেবেই এর যোগাযোগ সুবিধা
বেইজিং দ্বারা বেষ্টিত হওয়ার কারণে অনেক গুরুত্বপূর্ণ রেল সড়ক হেবেই অতিক্রম করেছে। তার মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হচ্ছে জিংগুয়াং রেল লাইন হেবেই এর উত্তর থেকে দক্ষিণ পর্যন্ত অনেক গুরুত্বপূর্ণ শহর অতিক্রম করেছে যেমন, জিংতাই, শিজিয়াঝুয়াং, বাউডিং এবং হানডান । জিংবাউ রেলওয়ে (বেইজিং-বাউতাউ), জিংঘু রেলওয়ে (বেইজিং-শাংহাই), জিংঘা রেলওয়ে (বেইজিং-কাউলুন) এবং জিংজিউ রেলওয়ে (বেইজিং-হারবিন) হলো অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রেলসড়ক।

কিংহুয়াংডাও হলো বোহাই সমুদ্র বরাবর চীনের দ্বিতীয় বৃহত্তম নৌবন্দর। এর ক্যাপাসিটি হচ্ছে বছরে ১০০ মিলিয়ন মেট্রিক টনের উপরে। বোহাই সমুদ্রে আরও দু’টি সমুদ্র বন্দর হচ্ছে হুয়াংহুয়া ও জিংতাং। আপনি যদি হেবেই ভ্রমণ করেন তবে অবশ্যই শিজিয়াঝুয়াং এর ঝেংডিং বিমানবন্দর হয়ে ভ্রমণ করবেন।

হেবেই এর ভ্রমণ আকর্ষণ
কিংহুয়াংডাং শহরের কাছে শাংহাইগুয়ান গিরিপথ মিং গ্রেট ওয়াল উপকুলের পূর্ব সীমানায় অবস্থিত পৃথিবীর প্রথম গিরিপথ। এই গিরিপথেই জেনারেল ঊ সাংগুই ১৬৪৪ সনে সৈন্যবাহিনীর উদ্দেশ্যে মিঙ এ তোরণ উত্তোলন করেছিলেন।

এটা ৩০০ বছরের পুরনো এবং মাঞ্চুরিয়ায় প্রবেশ এবং নির্গমনের মানসিক পথও। শাংহাইগুয়ান এ অবস্থিত বেইডাইহে নামে পরিচিত অত্যন্ত জনপ্রিয় বীচ রিজোর্ট সরকারী কম্যুনিস্ট পার্টির উর্ধতন কর্মকর্তাদের জন্য তৈরী করা হয়েছে।

‘চেংডে মাউন্টেন রিজোর্ট’ ইউনেস্কো স্বীকৃত ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের অন্তর্ভূক্ত। এর আশেপাশে দেখার মতো প্রচুর মন্দির রয়েছে। চেংডে মাউন্টেন রিজোর্ট রেহে প্রাসাদ নামেও পরিচিত যেটা কিং রাজবংশের সম্রাটদের গ্রীষ্মকালীন অবকাশ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো। চেংডে মাউন্টেন রিজোর্ট নির্মিত হয়েছিল ১৭০৩ সাল থেকে ১৭৯২ সালের মধ্যে এবং এখানে কমপ্লেক্স, বড় একটি পার্ক এলাকা যেটার সাথে কজওয়ে, প্যাভিলিয়ন, হ্রদ, ব্রীজ ইত্যাদি রয়েছে। এ এলাকায় তিব্বতীয় বৌদ্ধ ও চীনা হানদের প্রচুর ঐতিহাসিক মন্দির রয়েছে।

এখানে অনেক ঐতিহাসিক রাজকীয় সমাধি রয়েছে যেগুলি ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের অন্তর্ভূক্ত। পূর্ব কিং সমাধিগুলো জুনহুয়া রাজবংশের রাজকীয় সমাধিগুলোর অন্তর্ভূক্ত। রাজকীয় পরিবারের সম্রাট সম্রাজ্ঞীদের ১৬১টি সমাধি এখানে রয়েছে। ঈজিয়ান রাজবংশের রাজকীয় সমাধিগুলো পশ্চিম কিং সমাধিগুলোর অন্তর্ভূক্ত।

উত্তর আধুনিকতাপূর্ব চীনা কারিগরী যুগের উতকৃষ্ট উদাহরণ হলো ঝাউঝাউ আনজি ব্রীজ। এটা চীনে সবচেয়ে পুরাতন পাথরের তৈরী ধনুকাকৃতি সেতু এবং এটি সুই রাজবংশের লি চুন এর দ্বারা নির্মিত হয়।

ঐতিহাসিক ঝিলি গভর্নর’স রেসিডেন্স বাউডিং এ অবস্থিত যেটা একসময় প্রাদেশিক রাজধানী ছিল।

Social Media